প্রায় সবার নামই ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকায়

0
32

কাবুল দখলের তিন সপ্তাহের মাথায় গত মঙ্গলবার তালেবান যে সরকারের ঘোষণা দিয়েছে, তাতে শুধু নিজেদের মতাদর্শের লোকজনকেই ঠাঁই দেওয়া হয়েছে। তাদের কেউ কেউ আবার জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘কালো তালিকাভুক্ত’, ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘মাদক কারবারি’। দেশটির অন্যান্য জনগোষ্ঠী-সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বশীল কাউকে মন্ত্রিসভায় রাখা হয়নি, স্থান দেওয়া হয়নি কোনো নারীকেও।

এর ওপর সদ্য ঘোষিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ‘শরিয়াহ আইন’ বাস্তবায়ন করতে বলেছেন তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা। এ অবস্থায় নারীদের পড়ালেখা বন্ধসহ তাদের স্বাধীনতা হরণ, ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপর দমন-পীড়ন আর কট্টর বিধি-নিষেধের আগের ‘তালেবানি শাসন’ই আফগানদের ওপর চেপে বসতে যাচ্ছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। তালেবানের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিয়ে এরই মধ্যে উদ্বেগ জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আফগানিস্তানের তালেবানবিরোধীরা এই সরকারকে স্বীকৃতি না দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। অবশ্য শুরু থেকেই তালেবানের অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকারের ঘোষণা নিয়ে নিঃসংশয় হতে পারছিল না বিশ্বসম্প্রদায়। শেষমেষ তাদের সংশয়ই সত্যি হলো।

নতুন তালেবান সরকারে যাঁরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে কারো ওপর রয়েছে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা, কেউ বা রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকায়, কারো বা মাথার দাম ঘোষণা করা হয়েছিল কোটি ডলার। আর যুক্তরাষ্ট্রের চোখে হাক্কানি নেটওয়ার্ক একটি ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’। এই গোষ্ঠীর সদস্যকেও সরকারে রেখেছে তালেবান। ফলে তালেবানের সরকারের ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডের দিকে সতর্ক চোখ থাকবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের।

সরকারের আনুষ্ঠানিক কোনো পদে না থাকলেও তালেবানের ‘সুপ্রিম লিডার’ হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার পরামর্শের বাইরে কোনো কিছু হবে না বলেই মনে করা হচ্ছে। গতকাল দেওয়া তাঁর প্রথম বিবৃতিতে সেই ইঙ্গিত স্পষ্টও হয়েছে। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে আফগানিস্তানের সব কর্মকাণ্ডই পরিচালিত হবে শরিয়াহ আইন অনুসারে। দেশবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, কারো উচিত হবে না দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া। ‘ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের’ সঙ্গে কারো কোনো সমস্যা নেই। নব্বইয়ের দশকে শরিয়া আদালতের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আখুন্দজাদা তালেবানের রাজনৈতিক, সামরিক, ধর্মীয়—সব বিষয়েরও শীর্ষ নীতিনির্ধারণী ব্যক্তি। ১৯৯৬ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর তালেবান তাদের মতো করে ধর্মীয় আইন চালু করে। সেই সময় হত্যাকারী ও ব্যভিচারীদের প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হতো এবং চোরের হাত কেটে ফেলা হতো। আখুন্দজাদা এর অন্যতম পরামর্শদাতা ছিলেন। তালেবানের নতুন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন হলেন :

মোল্লা মোহাম্মদ হাসান আখুন্দ, প্রধানমন্ত্রী

তালেবান প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা ওমরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও রাজনৈতিক উপদেষ্টা ছিলেন। ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে তালেবান সরকারের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তালেবানের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী কাউন্সিল ‘রেহবারি শুরা’র এই সদস্য কান্দাহার প্রদেশের গভর্নরও ছিলেন। জাতিসংঘের কালো তালিকায় তাঁর নাম রয়েছে। আনুমানিক বয়স ৬০ বছর।

আবদুল গনি বারাদার, উপপ্রধানমন্ত্রী

তালেবানের সহপ্রতিষ্ঠাতা। ২০১০ সালে করাচিতে গ্রেপ্তার হন। দোহায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনা শুরু হওয়ার পর ২০১৮ সালে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে কাতারের দোহায় চালু করা তালেবানের রাজনৈতিক দপ্তরের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের চুক্তিতে তালেবানের পক্ষে স্বাক্ষর করেছেন তিনি।

আব্দুল সালাম হানাফি, উপপ্রধানমন্ত্রী

জাতিসংঘের কালো তালিকায় রয়েছেন। আগের মেয়াদে তালেবান সরকারের উপশিক্ষামন্ত্রী ছিলেন। সে সময় মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। মাদকপাচারের জন্যও তাঁকে অভিযুক্ত করে আসছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ।

সিরাজুদ্দিন হাক্কানি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

বাবা জালালুদ্দিন হাক্কানির মৃত্যুর পর তিনি হাক্কানি নেটওয়ার্কের নেতা হন। আফগানিস্তানে আফগান বাহিনী এবং তাদের পশ্চিমা মিত্রদের ওপর সবচেয়ে ভয়াবহ কিছু হামলার জন্য তাঁকে দায়ী করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআইয়ের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকায় রয়েছেন। তাঁর মাথার জন্য এক কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। আনুমানিক বয়স ৪৫ বছর।

মোহাম্মদ ইয়াকুব, প্রতিরক্ষামন্ত্রী

তালেবানের প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা ওমরের ছেলে তিনি। বর্তমানে তালেবানের সামরিক শাখার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১৬ সালে তালেবান নেতা আখতার মানসুর নিহত হওয়ার পর তালেবানের একটি অংশ তাঁকে তালেবানের সুপ্রিম লিডার করতে উদ্যোগী হয়। তাঁর বয়স কম ও অনভিজ্ঞ হওয়ায় তা সম্ভব হয়নি।

এ ছাড়া মৌলভি আমির খান মুত্তাকিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, মোল্লা হিদায়াত বদরিকে অর্থমন্ত্রী, আবদুল হাকিম ইশাকজিকে বিচারমন্ত্রী এবং খাইরুল্লাহ সাইদওয়ালি খয়েরখাকে তথ্যমন্ত্রী করা হয়েছে।

‘শরিয়াহ আইন’ বাস্তবায়নের আহ্বান : অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ‘শরিয়াহ আইন’ বাস্তবায়ন করতে বলেছেন তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা। গত ১৫ আগস্ট কাবুল তালেবানের দখলে যাওয়ার পর থেকে তাঁকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। তবে গতকাল তিনি প্রথমবারের মতো একটি বিবৃতি দেন। এতে বলেন, ‘আমি দেশবাসীকে এটা নিশ্চিত করতে চাই যে ইসলামিক আইন ও শরিয়াহ আইন বাস্তবায়নে এই সরকার কঠোর পরিশ্রম করে যাবে।’ আখুন্দজাদা বলেন, তালেবানের নতুন সরকার দেশে দীর্ঘ মেয়াদে শান্তি, অগ্রগতি ও উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাবে।

যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ : আফগানিস্তানে সদ্য ঘোষিত তালেবান সরকারের সদস্যদের নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র তালেবানের নতুন সরকার নিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানের নতুন সরকারে থাকা ব্যক্তিদের সম্পর্কে অবগত। সরকারে তালেবান ও তাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা থাকলেও কোনো নারী নেই। তালেবান সরকারের কয়েকজন সদস্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের প্রত্যাশা স্পষ্ট করেছি। আফগানিস্তানের জনগণের একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার পাওয়া উচিত।’

‘পিএইচডি-মাস্টার্স ডিগ্রির মূল্য নেই’ : তালেবানের নবনিযুক্ত শিক্ষামন্ত্রী শেখ মৌলভি নুরুল্লাহ মুনির বলেছেন, ‘এখনকার দিনে পিএইচডি ডিগ্রি, মাস্টার্স ডিগ্রির কোনো মূল্য নেই। আপনারা দেখুন, ক্ষমতায় থাকা মোল্লা ও তালেবান কারো পিএইচডি, এমএ, এমনকি হাই স্কুল ডিগ্রিও নেই, কিন্তু তাঁরা সবার সেরা।’ তাঁর এমন বক্তব্যের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। সূত্র : এএফপি, বিবিসি, রয়টার্স।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here