চীনে করোনা আক্রান্তদের সুস্থ করে তুলতে যে ওষুধটি সবচেয়ে বেশি কার্যকর হয়েছে

চীনের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া নভেল করোনাভাইরাসে বিশ্বজুড়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দুই লাখ ছাড়িয়েছে। এ ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট রোগ মৃতের সংখ্যাও ৮ হাজার ২০০ পেরিয়েছে।এদিকে, চীনের স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য জাপানে ব্যবহৃত এক ধরনের ওষুধ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে চীনে কার্যকর হয়েছে। জাপানের গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, মিডল ইস্ট নর্থ আফ্রিকা ফিনান্সিয়াল নেটওয়ার্ক ও মিন্ট প্রেস নিউজ দাবি করছে, ইন্টারফেরন আলফা টু-বি’ নামে পরিচিত কিউবার এক ওষুধ করোনার মুক্তিতে ব্যাপক কাজ করছে। চীনের চিকিৎসকরা করোনা আক্রান্তদের সুস্থ করে তুলতে এই ওষুধটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছেন। এটি ব্যবহার করে এক হাজার পাঁচশোরও বেশি রোগীকে সুস্থ করে তুলেছেন তারা। করোনা রোগ প্রতিরোধের জন্য চীনের জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশনের নির্বাচিত ৩০টি ওষুধের মধ্যে অন্যতম এটি।

চীনের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ঝাং শিনমিন বলেছেন, জাপানের ফুজিফ্লিম কোম্পানির সহযোগী প্রতিষ্ঠান টয়ামা কেমিক্যাল ওই ওষুধটির উৎপাদনকারী। তাদের এই ওষুধটি উহান ও শেনজেন শহরে করোনা সংক্রমিত ৩৪০ জন রোগীর ওপর প্রয়োগ করে আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেছে।

চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহানেই গত বছরের ডিসেম্বরে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। এখন এ ভাইরাস বিশ্বের ১৬৫টি দেশে ছড়িয়েছে। বুধবার পর্যন্ত মারা গেছে আট হাজারের বেশি মানুষ। আক্রান্তের সংখ্যা দুই লাখ ছাড়িয়ে গেছে।

চীনের কর্মকর্তা ঝাং শিনমিন বলেন, ‘এ ওষুধটি যথেষ্ট নিরাপদ এবং রোগ সারাতে নিশ্চিতভাবে এটি কার্যকর।’ শেনজেনে যেসব রোগীকে জাপানের এ ওষুধটি দেওয়া হয়েছে তাদের সবাই চারদিনের মধ্যেই সেরে উঠেছেন। আর যাদের এ ওষুধ দেওয়া হয়নি তারা সারতে ১১ দিন সময় নিয়েছেন। এর পাশাপাশি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি যারা এ ওষুধটি পেয়েছেন তাদের ফুসফুসের অবস্থাও ৯১ ভাগ সেরে উঠেছে। আর যাদের এ ওষুধ দেওয়া হয়নি তাদের ফুসফুসের অবস্থার ৬২ শতাংশ উন্নতি ঘটেছে। তবে ওষুধটির এ কার্যকারিতার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান টয়ামা কেমিক্যাল।

হালকা ও মাঝারি মাত্রায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে জাপানের চিকিৎসকেরাও এ ওষুধটি প্রয়োগ করছেন। এটি দেওয়ার পর রোগীর পরিস্থিতি আর খারাপের দিকে যাবে না, এই আশাতেই ওষুধটি প্রয়োগ হচ্ছে। তবে জাপানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেছেন, যেসব রোগীর অবস্থা জটিল তাদের জন্য এ ওষুধটি কার্যকর নয়।

এদিকে, ১৯৮৬ সালের দিকে কিউবার সেন্টার ফর জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি (সিআইজিবি) এই ওষুধটি আবিষ্কার করে। জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এই ওষুধটির ব্যবহার চালু হওয়ার পর থেকে হাজার হাজার কিউবার রোগী সুস্থ হয়েছেন। এটি এইচআইভি এইডস, হেপাটাইটিস-বি ও সি, হার্পিস জোস্টার বা শিংলস, ডেঙ্গু ও বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়েছে। এই ওষুধটি মানবদেহের ইন্টারফেরনের প্রাকৃতিক উৎপাদন বাড়ায় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আরো জোরদার করে। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসার ক্ষেত্রেও এটি কার্যকর।

ওষুধটির আবিষ্কার হয় কিউবায়। চীনের জিলিন প্রদেশে অবস্থিত চ্যাংচুন হেবার বায়োলজিক্যাল টেকনোলজিতে এটির উৎপাদন হয়। জৈবপ্রযুক্তিতে দুই সমাজতান্ত্রিক দেশের মধ্যে এক চুক্তির অংশ হিসেবে এটি যৌথ উদ্যোগে উৎপাদিত হচ্ছে। এটি দক্ষিণ কোরিয়ার হাজার হাজার মানুষকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছে। আট হাজার সংক্রমিত ব্যক্তির মধ্যে মাত্র ৭২ জন মারা গেছেন। জার্মানিও মহামারির সঙ্গে লড়াই করার জন্য অ্যান্টিভাইরালগুলো চ্যাংহবারের কাছ থেকে কিনে নিয়েছে। সেখানেও এই ভাইরাসে সংক্রমিত তিন হাজার একশ ৫৬ জনের মধ্যে কেবল তিনজন মারা গেছেন।

কিউবার এই ওষুধের কার্যকারিতা জানার পরেই জনপ্রিয় হয়ে যায় ‘ইন্টারফেরন আলফা টু-বি’। এরপর থেকে সারা বিশ্ব থেকে এই ওষুধ কেনার অর্ডার পেতে শুরু করে কিউবা। করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য ল্যাটিন আমেরিকান, ক্যারিবীয় ও ইউরোপীয় বেশ কয়েকটি দেশ কিউবার কাছ থেকে চিকিৎসা সহায়তার অনুরোধ করেছে।চলতি মাসের ১৪ তারিখে ফার্মাসিউটিক্যাল সংস্থা বায়কিউবা ফারমা গ্রুপের সভাপতি এডুয়ার্ডো মার্টিনেজ বলেন, সারা বিশ্বের বিপুল সংখ্যক দেশ থেকে এই ওষুধ বিক্রির অনুরোধ পাওয়ার পরেই এর উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে চলেছে। তিনি আশ্বস্ত করেন যে, সিআইজিবির হাতে প্রয়োজনীয় পরিমাণ সরবরাহ রয়েছে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদাও মিটাতে পারবে।

এরই মধ্যে কিউবা ইতালিতে একটি চিকিৎসক দল পাঠিয়েছে। সেই সঙ্গে ‘ইন্টারফেরন আলফা টু-বি’র একটি চালানও পাঠিয়েছে। করোনা মোকাবেলায় ইতালিকে সহায়তা করতেই মূলত ওষুধ আর চিতিৎসক তারা পাঠিয়েছেন। চীনের পরই এই মারণ ভাইরাস সবচেয়ে বেশি আঘাত হেনেছে ইতালিতে।

কিউবা ‘ইন্টারফেরন আলফা টু-বি’ পানামা ও ভেনিজুয়েলায়সহ ল্যাটিন আমেরিকার কয়েকটি দেশে পাঠিয়েছে। যাদের ভাইরাস সংক্রমণের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে তাদের ওপর এই ওষুধ প্রয়োগ করা হচ্ছে। চিকিৎসা কর্মী, পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও করোনভাইরাস সংক্রমিত লোকদের চিকিৎসা পরিকল্পনা পাঠিয়ে সহায়তা করার জন্য কিউবাকে অনুরোধ করেছে জামাইকা, সেন্ট কিটস অন্ড নেভিস, সেন্ট ভিনসেন্ট এবং গ্রেনাডার সরকার।

এদিকে, সবার অনুরোধ রাখতে চলেছে কিউবা। দেশটির ওষুধ শিল্প ইন্টারফেরন আলফা টু-বিসহ করোনার চিকিৎসা করা যায় এমন ২২ ধরনের ওষুধের উৎপাদন বৃদ্ধি করতে যাচ্ছে। তারা উৎপাদন বৃদ্ধি করার গ্যারান্টিও দিয়েছে। এডুয়ার্ডো মার্টিনেজ জানিয়েছেন, করোনা মোকাবেলার ওষুধ সরবরাহ করার জন্য অনেক দেশেই অনুরোধ করছে। আমরা ওষুধ সরবরাহ করবো। কারণ আমাদের প্রয়োজনীয় সামর্থ্য রয়েছে। এতে দেশে ওষুধ সঙ্কটে পড়বে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here