করোনার আক্রমণ ঠেকাতে কয়েকটি ঘরোয়া ব্যবস্থা

বিশ্বজুড়ে করোনার প্রাদুর্ভাব শুরুর পর প্রায় চার মাস গত হলো। পৃথিবীতে এ পর্যন্ত যতগুলো অসুখ এসেছে তার মধ্যে সবচেয়ে ছোঁয়াচে বা সংক্রামক হচ্ছে এই কভিড-১৯। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান এখনো এই করোনাভাইরাসের কোনো প্রতিষেধক কিংবা ওষুধ কিছুই বের করতে না পারলেও এখন পর্যন্ত যতটুকু অগ্রগতি হয়েছে তাও একেবারে অজানা ও ঘন ঘন রূপ পরিবর্তনকারী এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে কম অর্থবহ নয়। এখন পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে মোট ছয়টি ভ্যাকসিনের ও পাঁচটি ওষুধের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে। এ ছাড়া আরো দুই ডজন অন্য রোগের প্রচলিত ওষুধও ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল অর্থাৎ মানব শরীরে পরীক্ষা করা হচ্ছে। আমরা সারা পৃথিবীর মানুষ এখন কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করছি, যাতে অন্তত কমপক্ষে একটি করে টিকা ও ওষুধ আবিষ্কৃত হয়।

যত দিন প্রতিষেধক ও ওষুধ না পাওয়া যায় তত দিন মানুষকে করোনাবিষয়ক স্বাস্থ্যবিধিগুলো মেনে চলতে হবে পুরোপুরি নিষ্ঠার সঙ্গে। এতটুকু ছাড় দেওয়া যাবে না। লকডাউন মেনে ঘরে থাকতে হবে। অত্যন্ত জরুরি প্রয়োজন হলে সামাজিক দূরত্ব মেনে অল্প সময়ের জন্য বাইরে যাওয়া যাবে। ফিরে এসে বাইরের কাপড় ধুয়ে ফেলতে হবে। চশমা, ঘড়ি, মোবাইল, মানিব্যাগ, ভ্যানিটি ব্যাগ, বেল্ট ইত্যাদি হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে মুছে ফেলতে হবে। বাইরের জুতা ঘরে আনা যাবে না। ইদানীং অনেকে কোনো লক্ষণ ছাড়াই করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে। তারা যদি বাইরে গিয়ে থুথু, কফ ফেলে, অনেকেরই যেখানে-সেখানে থুথু ফেলার বাজে অভ্যাসটি আছে, তাহলে হাঁচি ও কাশির মতোই বিপুল পরিমাণ করোনাভাইরাস সে ছড়িয়ে দেবে। ঘরে থাকা তাই সবদিক দিয়েই নিরাপদ।

ঋতুচক্রের নিয়ম অনুযায়ী আমাদের দেশে সামনের দিনগুলোতে আরো গরম পড়বে, সূর্যের তেজ বাড়বে ও ঘনঘন বৃষ্টি হবে। আমরা আগেই বিভিন্ন সময় বলেছি যে এর ফলে ভাইরাসটির আক্রমণের তীব্রতা কিছুটা কমার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যান্য ভাইরাসের নিয়মই তাই। অতি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটিসহ অন্য বিজ্ঞানীরা বলছেন, উচ্চ আর্দ্রতায় ৫৬ সেন্টিগ্রেডের বেশি তাপমাত্রায় কিংবা রোদের মধ্যে থাকা সামান্য অতিবেগুনি রশ্মির সংস্পর্শে এলে করোনাভাইরাস মরে যায়। এটি আমাদের মতো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশের জন্য ভালো খবর। কিন্তু মানুষ যদি ঘরে না থাকে এবং বাইরে গিয়ে সামাজিক দূরত্ব মেনে না চলে তাহলে এতে কোনো লাভ হবে না।

বার্ড ফ্লু এবং সোয়াইন ফ্লুর চিকিৎসায় সবচেয়ে বেশি কার্যকর ওষুধটির নাম অসেলটামিভির, যা সুইজারল্যান্ডের ওষুধ কম্পানির হফম্যান লা রোশ আবিষ্কার করেছেন বিরিয়ানিতে ব্যবহৃত মসলা স্টার এনিস থেকে। এটা খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। এই মসলাটি তারার মতো দেখতে বলে এর এমন নাম এবং এটি খুব সুন্দর গন্ধযুক্ত। বার্ড ফ্লুর ভাইরাস ও বর্তমান করোনাভাইরাসের মধ্যে বেশ কিছু মিল থাকার কারণে চীন ও অন্যান্য দেশে এবারের করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় অন্যান্য ওষুধের সঙ্গে এই অসেলটামিভিরও ব্যবহৃত হয়েছে এবং উপকারও পাওয়া গেছে। তাই এখনকার এই সংকটকালে যদি ওষুধটির মূল উৎস এই মসলাটি আমরা চায়ের মতো দিনে কয়েকবার খাওয়া শুরু করি তাতে নিশ্চয়ই দোষের কিছু নেই।

এই চা যখন বানাব তখন আরো কিছু উপাদান যেমন—আদা, তেজপাতা, লবঙ্গ, দারচিনি ও এলাচি এর সঙ্গে দিয়ে ভালো করে ফুটিয়ে নেওয়ার পর যে চা পাওয়া যাবে সেটা দিনে কয়েকবার খাওয়া যেতে পারে। এর সবই ঠাণ্ডা লাগা, সোর থ্রোট, গলা ব্যথা ও প্রদাহে কিছু কাজ করে বলে বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত। সঙ্গে চা পাতাও দেওয়া উচিত, কারণ এতে থাকা ক্যাফেইন, থিওব্রোমিন ও থিওফাইলিন কিছুটা ব্রংকোডাইলেটর কাজ করে, অর্থাৎ ফুসফুসের ক্ষুদ্র শ্বাসনালিগুলো এরা কিঞ্চিৎ প্রসারিত করে বলে শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া সহজ করে। এই এক্সট্রাক্ট বা পাঁচন বা চা—যে নামেই ডাকি না কেন, গরম গরম খেতে হবে। কারণ গরম পানিরও কিছুটা এই ব্রংকোডাইলেটর গুণ আছে। কাশি থাকলে মধু মিশিয়ে খেতে পারেন। তাতে গলার খুসখুসে ভাব কমার কথা। তবে ডায়াবেটিস থাকলে মধু ব্যবহার করা যাবে না। সঙ্গে লেবুর রস মেশালে স্বাদ বৃদ্ধির পাশাপাশি ভিটামিন সি পাওয়া যাবে, যা এই সময়ে করোনা প্রতিরোধের পথ্যে থাকা বাঞ্ছনীয়। উল্লিখিত জিনিস কোনো কোনোটা ঘরে না থাকলে এগুলো বাদ দিয়েই অন্য উপাদানগুলো দিয়ে এই পাঁচন বানানো যাবে। তবে সব জিনিস থাকলে ভালো হয়।

সর্দি বা গলা ব্যথা হলে আরো একটি জিনিস এর সঙ্গে যোগ করা যায়। তা হলো হলুদের গুঁড়া আধা চা চামচের কম। হলুদে থাকে কারকিউমিন, যা প্রাকৃতিক অ্যান্টিবায়োটিকের মতো। আমাদের লোক-চিকিৎসার ঐতিহ্যে ঠাণ্ডা লাগার এ রকম সমস্যায় হলুদ খুব কাজে দেয়।

তবে মনে রাখতে হবে বর্তমানের কঠিন সময়ে এসব প্রকৃতিনির্ভর চিকিৎসাগুলো কোনো অবস্থায়ই আধুনিক বা এলোপ্যাথি চিকিৎসার বিকল্প নয়। এটা একেবারেই একটা ঘরোয়া চিকিৎসা, যা নিয়মিতভাবে আমরা ব্যবহার করে কিছু উপকার পেতে পারি। কিন্তু উপসর্গগুলো কমছে না বা বেড়েই যাচ্ছে—এমন মনে হলে ডাক্তারের পরামর্শ নিতেই হবে।

সর্দি ও নাক বন্ধ হলে গলা ও নাকের গোড়ার ফোলা জায়গায় গরম ছেঁক দেওয়া এবং গরম পানির বাষ্প বা ভাপ দিনে কয়েকবার নিলে কাজ হতে পারে। খুব ভালো হয় যদি দিনে কয়েকবার গরম লবণ-পানি দিয়ে গড়গড়া দেওয়া যায়। এতে গলার ব্যথা, ফোলা ও চুলকানি কমার কথা। তবে কখনোই ঠাণ্ডা কিছু খাওয়া যাবে না। ঠাণ্ডা পানিও না। করোনা যত দিন আছে তত দিন হালকা গরম পানিই খেতে হবে।

ঠাণ্ডা, সর্দি, নাক বন্ধ, নাক দিয়ে পানি পড়া ইত্যাদিতে নাক ও মুখ দিয়ে মিনিট পাঁচেক ধরে গরম বাষ্প টেনে নিলে অর্থাৎ শ্বাস নিলে বেশ আরাম হয়—এটাও ন্যাচারোপ্যাথি। গরম বাষ্প পাওয়ার জন্য একটি পাত্রে পানি জ্বাল দিয়ে ফোটাতে হবে। পানি ফুটতে শুরু করলে ঢাকনাটি একটু সরিয়ে দিলে ফাঁকা অংশটি দিয়ে যে সাদা বাষ্পটি গলগল করে বেরিয়ে আসবে সেটি একটু দূর থেকে (যাতে নাকে-মুখে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি তাপ না লাগে) নাক ও মুখ দিয়ে টেনে নিতে হবে। গরম বাষ্পের কিছুটা গরম কুণ্ডলীর মধ্যে এইভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নিলে বুকে জমে যাওয়া জমাট কফও বেরিয়ে আসতে সহায়তা হয়। 

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের এই তাণ্ডবের মধ্যে এই গরম বাষ্প দিয়ে চিকিৎসার বিষয়টি নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বেশ কিছু বিজ্ঞানী মহলে নতুন করে আলোচনা ও গবেষণা শুরু হয়েছে। তাঁরা বলছেন, এক ঘণ্টা পর পর পাঁচ মিনিট করে কয়েকবার গরম বাষ্পের শ্বাস নিলে নাসারন্ধ্র ও সাইনাসে নাকি করোনা থাকতে পারে না। যদি তাই হয় তাহলে তো ভারী সুসংবাদ।

কিন্তু যত ওষুধই খাই বা যত ন্যাচারোপ্যাথিই রপ্ত করি না কেন, ঘরে থাকা অর্থাৎ ঘর থেকে একেবারেই না বেরোনো আজ সবচেয়ে জরুরি। বাঁচতে চাইলে ঘরে থাকতে হবে। কারণ ঘরে না থাকার কারণে অর্থাৎ সামাজিক দূরত্ব মেনে না চলার কারণে আমাদের দেশে করোনার আক্রমণটা ক্রমাগতই বেড়ে যাচ্ছে। আসুন আমরা সবাই ঘরে থাকি। কিছুদিন নিজে নিজেই ঘরে বন্দি থেকে করোনা থেকে দূরে থাকি। আর ঠাণ্ডা যাতে একেবারেই না লাগে তার জন্য সবাই সচেষ্ট থাকি। প্রয়োজনে অন্যান্য চিকিৎসার সঙ্গে সঙ্গে ঘরোয়া চিকিৎসা ব্যবহার করি। কাশি ও হাঁপানি রোগী এবং ধূমপায়ীদের জন্য এখন চূড়ান্ত বিপজ্জনক সময়। তাদের ঘরে থাকা আরো বেশি জরুরি।

লেখক : অধ্যাপক, পরিচালক

বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

abmfaroque@yahoo.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here